প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান | ঋক বৈদিক সমাজ | মৌর্যযুগে 

প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান | ঋক বৈদিক সমাজ | মৌর্যযুগে 

যুগ যেমন বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে সব কিছুই বদলেছে। বদলেছে সমাজ , বদলেছে প্রাকৃতিক পরিবেশ , সামাজিক , অর্থনৈতিক পরিবেশ , তেমনি  প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান নানা সময়ে নানা বিষয়বস্তু বদলেছে।

প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান
প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান

প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান

পুরান , রামায়ণ, মহাভারত , কৌটিল্যের লেখা অর্থশাস্ত্র , মেগাস্থিনিস এর ইন্ডিকা , নানা প্রাচীন গ্রন্থে প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান এর কথা উল্লেখ করা আছে। আজ আমাদের আলোচনার বিষয় প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান এর সাথে যুগের অবস্থান কিভাবে বদলেছে তা নিয়ে। 

ঋক বৈদিক সমাজ

প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান এর সাথে ঋক বৈদিক সমাজ অবস্থান, এখনকার বর্তমান অবস্থান এর অনেক টা মিল আছে। তবুও সেই সময় এর মেয়েদের স্বাধীনতার ভূমিকা ছিল অনেক। তার মধ্যে কিছু আলোচনা করা হচ্ছে। 

 পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতা 

 ঋক বৈদিক সমাজে নারীকে পুরুষের উপর নির্ভরশীল থাকতে হতো বিয়ের আগে নারীকে বাবা বা ভাইয়ের অধীনে এবং বিয়ের পর স্বামীর অধীনে জীবন কাটাতে হতো।

 বিবাহ রীতি 

ঋক বৈদিক সমাজে জীবন সঙ্গী নির্বাচনে মেয়েরা স্বাধীনতা ভোগ করতো অভিজাত পরিবারের বাইরে সতীদাহ প্রথার চলছিল না।  সমাজে বিবাহ রীতি অনুসারে বিধবা বিবাহের প্রচলন ওই সময় ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর পর দেওরকে বিয়ে করতে পারত।

 গৃহের বাইরে মেয়েরা 

ঋক বৈদিক সমাজে মেয়েদের গৃহবন্দী করে রাখা হতো না। সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গৃহের বাইরে মেয়েরা  স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারত।

 মেয়েরা ধর্মীয় কাজেতে

প্রাচীন ভারতে নারীর সামা
প্রাচীন ভারতে নারীর সামা

 ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপে স্ত্রীরা স্বামীকে সাহায্য করতে পারতো তাই তাদের বলা হত সহধর্মিনী। ঋক বৈদিক সমাজে “জুহু ” এবং “পৌলমীর” মত  মেয়েরা ধর্মীয় কাজেতে বিশেষ সাফল্য দেখিয়েছিলেন।

নারী শিক্ষা

ঋক বৈদিক যুগে নারী শিক্ষা ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছিল। এ যুগে “অ্যাপেলো” এবং “ঘোষা”  প্রভৃতি মহিলারা বিভিন্ন শাস্ত্র বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। কেউ কেউ বৈদিক মন্ত্র রচনা করেও বিখ্যাত হয়েছিল।

আরো পড়ুন

পরবর্তী বৈদিক সমাজ 

 ঋক বৈদিক যুগের তুলনায় পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর সামাজিক মর্যাদা অনেকখানি কমে গিয়েছিল।

কন্যা সন্তানের প্রতি অহিনা 

 পরিবারে কন্যা সন্তানের জন্ম কেও চাইতো না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সম্পত্তি অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। ওই যুগে ব্রাহ্মণের কথা উল্লেখ করা রয়েছে যে কন্যা হল অভিশাপ।

 শিক্ষা 

পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর শিক্ষার সুযোগ কিছুটা কমে গিয়েছিল। ” গার্গী এবং মৈত্রী ” প্রমুখ মহিলারা উচ্চ শিক্ষার পারদর্শিতা দেখিয়ে ছিলেন । ওই যুগে যে সমস্ত নারীর অবিবাহিত থেকে শিক্ষা ও ধর্মচর্চা করে সারা জীবন অতিবাহিত করতেন। তাদের বলা হতো ব্রহ্মবাদীনি। আর যে সমস্ত নারী বিবাহের আগে পর্যন্ত বিদ্যা চর্চা করতেন তাদের বলা হতো সদ্যদাহা।

 বিবাহ রীতি 

পরবর্তী বৈদিক যুগে বাল্যবিবাহ, পুরুষের বহুবিবাহ, পন প্রথা, নারী জীবনকে দূরবিসহ করে তুলেছিল।

 রাজনৈতিক অধিকার 

ক বৈদিক যুগে নারী সভাতে যোগ দেওয়ার যে অধিকার পেয়েছিল, পরবর্তী বৈদিক যুগের সেই অধিকার থেকে নারী বঞ্চিত হয়।

 মৌর্যযুগে 

 শিক্ষা

মৌর্য যুগে অভিজাত বংশের নারীরা লেখাপড়া শিখতো। এ যুগে নারীরা সামরিক শিক্ষা ও গ্রহণ করতে পারতো। কৌটিল এর অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায় এই যুগে অনেক নারী নিত্য,   কণ্ঠ ও মন্ত্র সংগীতে অধ্যাপনা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

 বিবাহ রীতি

এডুকে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী দ্বিতীয়বার বিবাহ করতে পারত। এযুগের স্বামী দুশ্চরিত্র হলে স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে পারত। স্ত্রীর পরপর কন্যা সন্তানের জন্ম দিলে স্বামী তাকে আট বছর অপেক্ষা করার পর ত্যাগ করতে পারত। মেগাস্থিনিস তার ” ইন্ডিকা “গ্রন্থে লিখেছেন সমাজের অসহায় নারীদের প্রচুর কষ্ট ভোগ করতে হতো।

 গার্হস্থ জীবন

 এ যুগে নারীরা গৃহে বিভিন্ন হস্তশিল্পের কাজ করত। গৃহস্থলীর ভূমিকা সামলানোর পাশাপাশি নারীরা স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের যোগ দিতেন।

পরবর্তী মৌর্য যুগ 

নারী শিক্ষা 

মৌর্য পরবর্তী যুগে অনেক মহিলা উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছিলেন। পানিনির রচনা থেকে জানা যায় যে এ যুগে নারীরা বেদের বিভিন্ন শাখা অধ্যায়ন করতেন।

 বিবাহ রীতি

 মৌর্য পরবর্তী যুগের সমাজে অনুলোম ও প্রতিলোম এই দুই ধরনের  বিবাহ রীতি প্রচলিত ছিল। মনু স্মিতিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, নারী শৈশবে পিতা, যৌবনে স্বামী বার্ধক্যে পুত্রের অভিভাবকত্বে অধীন জীবন কাটাবে।

 গুপ্ত যুগ 

 শিক্ষা 

গুপ্ত যুগে সম্ভাব্য পরিবারের মহিলারা উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পেতেন।  অমরকোষ গ্রন্থে শিক্ষিকাদের উপাধ্যা ও  এ যুগে রাজশ্রী, কাদম্বরী অনুসুয়া প্রমূখ নারী বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষা নিয়ে তাদের পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন।

 বিবাহ রীতি

গুপ্তযুগের মেয়েদের স্বামী নির্বাচনের অধিকার ছিল। গুপ্ত যুগে বিধবা বিবাহ প্রচলন থাকলেও সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল।

 সম্পত্তির অধিকার 

 গুপ্ত যুগে নারী সম্পত্তির অধিকার ভোগ করতে পারত। বিধবা স্ত্রী পুনরায় বিবাহ করলে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো।

   ধর্মীয় অধিকার 

গুপ্ত যুগে স্বামীর অনুমতি স্বপক্ষে স্ত্রী বিভিন্ন  সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার  অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারত।

মূল্যায়ন

 প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান খুব একটা ভালো ছিল না। ঋক বৈদিক সমাজে  মেয়েরা স্বাধীনতা করতে পারলেও সেটা পরবর্তী বৈদিক সমাজে ছিল না। আবার পরবর্তী বৈদিক সমাজে দেখা গেছে কন্যা সন্তান একটি অভিশাপ। সেই যুগেই গার্গী ও মৈত্রী নামক প্রমুখ মহিলারা উচ্চ শিক্ষায় পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। আর দেখা গেছে অবিবাহিত নারীরা শিক্ষা ও ধর্মচর্চায় সারা জীবন অতিবাহিত করেছে। আবার দেখা গেছে নারীকে অসম্মান করা হলে, যে সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলতো সেগুলি ব্যর্থ হয়ে যেত।  লেখক বলে গেছেন একজন নারী শৈশবের পিতার কাছে বিবাহের পরে তার স্বামীর কাছে এবং বার্ধক্যের সময় তার পুত্রের অধীনে থাকবে।

আরো পড়ুন

Uncategorized Indian-history